মার্কিন জনস্বাস্থ্য খাতে শঙ্কা, এশিয়ায় শেয়ারবাজারে প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে ওষুধ আমদানিতে শতভাগ শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের

বিদেশী ওষুধের ওপর বড় আকারের শুল্কের আভাস আগেই দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তবে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে বলেছিলেন।

বিদেশী ওষুধের ওপর বড় আকারের শুল্কের আভাস আগেই দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তবে তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে বলেছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার আচমকা জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানীকৃত ওষুধে ১ অক্টোবর থেকে ১০০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এক ধাপে শতভাগ শুল্ক আরোপ মার্কিন চিকিৎসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খবরটি প্রকাশের পর এশিয়ার শেয়ারবাজারেও বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। খবর ইউরো নিউজ ও নিক্কেই এশিয়া।

একই দিন রান্নাঘর ও বাথরুমের ক্যাবিনেট আমদানিতে ৫০ শতাংশ, সোফাসহ আসবাবপত্রে ৩০ ও ভারী ট্রাকে ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকরা বলছেন, আগস্টে আমদানি শুল্ক ও বাণিজ্য কাঠামোর মাধ্যমে মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্কনীতি যে শেষ হয়নি তার এ ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ট্রাম্পের বিশ্বাস, বাড়তি শুল্ক বাজেট ঘাটতি কমাতে সাহায্য করবে এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়াবে।

গত এপ্রিলে জাতীয় নিরাপত্তায় ওষুধ ও ট্রাক আমদানির প্রভাব নিয়ে তদন্ত শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬২ সালের ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্টে দেয়া ক্ষমতাবলে সেকশন ২৩২-এর আওতায় এ তদন্ত চালানো হয়। মার্চে কাঠ ও টিম্বার আমদানির ক্ষেত্রে একই ধরনের তদন্ত শুরু করে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ। তবে আসবাবপত্রের শুল্ক সেখান থেকে এসেছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের ঘোষণা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা নির্মাণ করছে বা নির্মাণাধীন রয়েছে এমন কোম্পানিগুলো ফার্মাসিউটিক্যাল শুল্ক থেকে ছাড় পাবে। তবে যারা এরই মধ্যে কারখানা স্থাপন করেছে, তাদের ক্ষেত্রে এ শুল্ক আরোপ প্রযোজ্য হবে কিনা তা স্পষ্ট নয়।

মার্কিন সেনসাস ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশটি প্রায় ২৩৩ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার মূল্যের ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্য আমদানি করেছিল। এখন নতুন শুল্কের কারণে কিছু ওষুধের দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে, যা দেশটিতে আকস্মিকভাবেই চিকিৎসা ব্যয় বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।

ওষুধের ওপর শতভাগ শুল্ক অনেককে চমকে দিয়েছে। এর আগে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, শুল্ক ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে, যাতে ওষুধ কোম্পানিগুলো যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা নির্মাণের সময় পায়। গত মাসে তিনি বলেছিলেন, শুরুতে ছোট হারে শুল্ক বসাবেন। ধীরে ধীরে তা ১৫০-২৫০ শতাংশে উন্নীত হবে।

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বছরের শুরুতে শুল্ক আরোপের হুমকি দেয়ার পর অনেক কোম্পানি বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জনসন অ্যান্ড জনসন, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, রোশ, ব্রিস্টল মায়ার্স স্কুইব ও ইলি লিলি।

নতুন ঘোষণার পর মার্কিন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্ভাব্য অবনতি নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন কানাডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট পাসকাল চ্যান। তিনি বলেন, ‘ওষুধের ওপর শুল্ক মার্কিন জনস্বাস্থ্যের বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা ব্যবস্থা চাপে পড়বে। হাসপাতালে ওষুধের ঘাটতি তৈরি হবে। মানুষ ওষুধ ব্যবহার কমাতে বা বাদ দিতে বাধ্য হতে পারে।’

ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়ার পর গতকাল এশিয়ার ওষুধ কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে ধস নামে। জাপানে ধসের শীর্ষে রয়েছে চুগাই ফার্মাসিউটিক্যাল, দিনের শেষে কোম্পানিটির শেয়ারদর কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানি ওৎসুকা হোল্ডিংস ৩ শতাংশ শেয়ারদর হারিয়েছে। তবে জাপানের সবচেয়ে বড় কোম্পানি তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালের শেয়ারদর প্রায় ১ শতাংশ সংকুচিত হলেও প্রতিষ্ঠানটি লেনদেন শেষ করে দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ ক্ষতি নিয়ে। কোম্পানিটি আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল।

সিউলে শীর্ষ ওষুধ প্রস্তুতকারক ইউহান, ডেউং ফার্মাসিউটিক্যাল ও চোং কুন ড্যাং ফার্মাসিউটিক্যাল, এসব কোম্পানির শেয়ার প্রায় ৩ শতাংশ করে কমেছে। হংকংয়ে হ্যাং সেং ফার্মাসিউটিক্যালস ও বায়োটেকনোলজি সূচক গত শুক্রবার সকালে সর্বোচ্চ ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। চীনের অন্যতম জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারক জিয়াংসু হেনগ্রুই ফার্মাসিউটিক্যালসের শেয়ারদর কমেছে ৪ শতাংশের বেশি। ভারতের নিফটি ফার্মা সূচক লেনদেন শুরুর আধাঘণ্টার মধ্যেই ২ দশমিক ৪ শতাংশ নেমে যায়।

অস্ট্রেলিয়ার শেয়ারবাজারের অন্যতম বৃহৎ কোম্পানি বায়োটেক জায়ান্ট সিএসএলের লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেয়ারদর ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পড়ে যায়। তবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ পতন নিয়ে দিন শেষ করে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত ছিল ফার্মাসিউটিক্যালস, যার আকার প্রায় ২২০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার বা ১৪০ কোটি মার্কিন ডলার।

ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ করেছে মেডিসিনস অস্ট্রেলিয়া নামের শিল্প সংগঠন। সংস্থাটি বলছে, ‘আমাদের সদস্যরা মুক্ত, ন্যায়সংগত ও উন্মুক্ত বাণিজ্য সমর্থন করে। মার্কিন প্রশাসনের লক্ষ্য স্থানীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হলেও এ পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগে প্রভাব ফেলবে, যেখানে অস্ট্রেলিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।’

বিশ্বের বৃহত্তম বায়োটেক কোম্পানিগুলোর একটি সিএসএল। অস্ট্রেলিয়ার কোম্পানি ব্ল্যাড প্লাজমাভিত্তিক থেরাপি ও ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী পল ম্যাকেঞ্জি জানিয়েছেন, শুল্ক তাদের ওপর প্রভাব ফেলবে না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রে কোম্পানিটির বড় আকারের অবকাঠামো রয়েছে এবং এর প্রধান কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়।

এদিকে শিল্প সংগঠন ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারারস অব আমেরিকা বলছে, অনেক ওষুধ কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করছে, যার পরিমাণ শত শত বিলিয়ন ডলার হতে পারে। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি এ বিনিয়োগ পরিকল্পনার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। কারণ উচ্চ শুল্কের ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং কোম্পানিগুলোর লাভ-ক্ষতির হিসাবের ওপর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে তারা তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে পারে বা স্থগিত করতে পারে।

আরও